কুমারীর মধ্যে মাতৃরূপ দর্শন—এ এক প্রাচীন রীতি। দুর্গাপুজোর অষ্টমীর সকালে বেলুড় মঠের কুমারী পুজো তো বিখ্যাত। অনেক বনেদিবাড়িতে তো বটেই, বহু বারোয়ারি পুজোতেও কুমারী পুজো হয়ে থাকে।
বেলুড় মঠের কুমারী পুজো: বেলুড় মঠের মহারাজেরা দেবী জ্ঞানে পুজো করেন কুমারী মাকে। বহু মানুষের সমাগম হয় সেই কন্যামাতার পুজোয়। পরনে লাল বেনারসি, বাহারি ফুলের সাজ, হাতে পদ্ম নিয়ে কুমারী তখন সাক্ষাৎ দেবী দুর্গা।
১৯০১ সালে স্বামী বিবেকানন্দের হাত ধরে কুমারী পুজোর সূচনা বেলুড় মঠে। এর পরে প্রথা মেনে কুমারী পুজো করা হয় বেলুড়ে। অনেকে বলেন, মৃন্ময়ী রূপে উমার আরাধনার সঙ্গে দেবীজ্ঞানে কুমারী বন্দনা না করলে পুজোর সার্থকতা থাকে না। বেলুড় মঠের মতো আদ্যাপীঠ, কামারপুকুরে শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মভিটেতেও কুমারীর আরাধনা করা হয়। এগুলি তো বিখ্যাত পুজো। এছাড়াও বহু বনেদিবাড়ি তো বটেই বারোয়ারি পুজোতেও কুমারী পুজোর চল রয়েছে।
কুমারী বাছাই ও শাস্ত্রীয় নির্দেশনা
কীভাবে বাছাই করা হয় কুমারী-দেবী? কী বলছে শাস্ত্র? এ বিষয়ে বিশিষ্ট সংস্কৃতজ্ঞ তথা পশ্চিমবঙ্গ বৈদিক আকাদেমির প্রধান নবকুমার ভট্টাচার্যের বক্তব্য, “সকল কন্যাই দেবীস্বরূপা। তবে পুজোর জন্য কুমারী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নির্দেশ রয়েছে শাস্ত্রে।”
নবকুমার ভট্টাচার্য তাঁর ‘দুর্গাপুজোর জোগাড়’ গ্রন্থে লিখেছেন— তন্ত্র অনুসারে ১ থেকে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত কুমারীকে পুজোর কথা বলা হয়েছে। সেখানে বয়স অনুযায়ী কুমারীর নামকরণও করা হয়েছে। কিন্তু শাস্ত্র অনুসারে দশম বর্ষীয়া কন্যাকেই কুমারী পুজো করা উচিত বলে স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে।
কুমারীর আকৃতি, প্রকৃতি সম্পর্কেও শাস্ত্রে নির্দেশ রয়েছে বলে নবকুমারবাবু জানান— “কুমারীর আকৃতি হবে সুন্দর, সুলক্ষণা এবং প্রকৃতি হবে শোভনা। কুমারী পুজো ছাড়া দুর্গাপুজোর পরিপূর্ণ ফল লাভ হয় না।” দেবী ভাগবতে বলা হয়েছে, এক বছর বয়সের কুমারী পুজোর যোগ্য নয়। দু’বছর থেকে দশ বছর বয়সী বালিকা কুমারী হবে।
বয়সভিত্তিক কুমারী নাম ও পুজোর ফল
- ২ বছর বয়সের কন্যা: নাম সরস্বতী। পুজোর ফল: দুঃখ, দারিদ্র্য ও শত্রু নাশ এবং ধন ও আয়ু বৃদ্ধি।
- ৩ বছর বয়সের কন্যা: নাম ত্রিধামূর্তি। পুজোর ফল: আয়ু বৃদ্ধি, ধনাগম ও বংশবৃদ্ধি।
- ৪ বছর বয়সের কন্যা: নাম কালিকা। পুজোর ফল: বিদ্যা, বিজয়, রাজ্য লাভ।
- ৫ বছর বয়সের কন্যা: নাম সুভগা। ফল: রোগনাশ।
- ৬ বছর বয়সের কন্যা: নাম উমা। ফল: শত্রুনাশ।
- ৭ বছর বয়সের কন্যা: নাম মালিনী। পুজোয় ধনৈশ্বর্য লাভ হয়।
- ৮ বছর বয়সের কন্যা: নাম কুম্ভিকা। পুজো করলে শত্রুদের মোহিত করা যায়।
- ৯ বছর বয়সের কন্যা: নাম কালসন্দর্ভা। পুজো করলে ঐহিক দারিদ্র্য ও শত্রু বিনাশ হয়।
- ১০ বছর বয়সের কন্যা: নাম অপরাজিতা। পুজোয় অভীষ্ট সিদ্ধ হয়।
কুমারী পুজোর ধ্যান ও প্রণাম মন্ত্র
নবকুমার ভট্টাচার্য বলেন, কুমারী পুজোয় এই ধ্যান করতে হয়—
“মা তুমি ত্রৈলোক্যসুন্দরী, কিন্তু আজ তুমি কালিকাস্বরূপে আমার সম্মুখে উপস্থিত। তুমি জ্ঞানরূপিণী, হাস্যময়ী, মঙ্গলদায়িনী।”
কুমারী পুজোর প্রণাম মন্ত্রের অর্থ:
“মা, তুমি প্রসন্না হলে আমাকে সৌভাগ্য দান করতে পার। তুমি সকল প্রকারের সিদ্ধি আমাকে দান কর। তুমি স্বর্ণ, রৌপ্য, প্রবাল কত রকমের অলঙ্কারে অলঙ্কৃত হয়েছ। তুমিই সরস্বতী। আমি তোমাকে প্রণাম করি।”
কুমারী পুজোর মাধ্যমে দেবী দুর্গার পূর্ণ শক্তি ও আশীর্বাদ লাভ হয় বলে বহু শাস্ত্রে বর্ণিত। তাই পুজোতে কুমারীকে দেবীর রূপে পূজার গুরুত্ব অপরিসীম।

Comments
Post a Comment