হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী সারা দিন সুষ্ঠুভাবে কাটানোর নিয়মাবলী এখানে দেওয়া হলো। আপনি চাইলে দৈনন্দিন জীবনে এই নিয়মগুলো অনুসরণ করে মন ও শরীরের শান্তি পেতে পারেন।
সকালের নিয়মাবলী
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠবার চেষ্টা করুন। হিন্দু শাস্ত্র মতে ব্রাহ্ম মুহূর্তে শয্যা ত্যাগ করা নিয়ম, তবে আধুনিক জীবনে তা সব সময় সম্ভব নয়। তাই চেষ্টা করুন সকাল ৫-৬টার মধ্যে শয্যা ত্যাগ করতে। ঘুম থেকে উঠে প্রথমে গুরুদেব ও ইষ্টদেবতাকে প্রণাম করুন। যারা দীক্ষা পায়নি, তারা ইষ্টদেবতাকে প্রণাম করুন।
এরপর করজোড়ে মা বসুমতীকে প্রণাম করুন, কারণ বসুমতীর বুকে আমরা পায়ে হেটে চলি। তিনি সর্বংসহা – সব সহ্য করেন। পুরুষেরা ডান পা আগে ফেলুন, পরে বাম পা; মহিলারা বাম পা আগে ফেলুন, পরে ডান পা। বিছানায় বসে বেড খাওয়া এড়িয়ে চলুন।
যোগা ও হাঁটা
দাঁত ব্রাশ করার পর আধা ঘণ্টা যোগা করুন। যোগা করতে না পারলে বাড়ির উঠোন, ছাদ বা নিকটস্থ পার্কে আধা ঘণ্টা জোরে হাঁটুন। বাড়ির বাচ্চাদেরও এই অভ্যাস শেখান।
স্নান ও পূজা
শৌচাদি সম্পন্ন করে স্নান করুন। স্নান শেষে পূজা করুন। মারোয়ারী, বিহারী, জাঠ, গুজরাটি সম্প্রদায় সকলে সকালের সময় স্নান শেষে একসাথে ভগবানের আরতি করে। তাই আপনারও সকালবেলায় পূজার অভ্যাস করুন। ঘরে ধূপ-ধুনো দিন, ধূপের গন্ধে সকল অশুভ প্রভাব দূর হয়।
যদি সকালবেলায় পূজা করতে না পারেন, তবে তুলসী, বেল, বট, অশ্বত্থ ও নিম বৃক্ষকে জল দিন। কারণ এই গাছগুলো পবিত্র, এদের মধ্যে দেবতারা বাস করেন। যারা দীক্ষিত, তারা গুরুপ্রদত্ত বীজমন্ত্র জপ করুন; অদীক্ষিত ব্যক্তিরা হাত তালি দিয়ে "হরে কৃষ্ণ" মহামন্ত্র কীর্তন করুন। এরপর সূর্য দেবতাকে প্রণাম ও জল অর্পণ করুন।
ভোজনের নিয়মাবলী
যারা অফিসে যাবেন, তারা অফিসে যান। যারা গৃহে থাকবেন, তারা সকাল ১২টা থেকে ২টার মধ্যে মধ্যাহ্ন ভোজ সমাপ্ত করুন। ভোজনের সময় থালাকে "জয় মা অন্নপূর্ণা" বলে নমস্কার করুন। মনে রাখুন, অনেক ভিক্ষুকই অন্ন পায় না, আপনি যা পেয়েছেন তা মা অন্নপূর্ণার দয়ায়। শাস্ত্র অনুযায়ী পেট ভরে না খেয়ে খাবেন, বাকি খাবার পশু-পাখিদের দিন।
দুপুরে কেউ গৃহে আসলে তাকে অবশ্যই ভোজ করান। হিন্দু বাড়িতে অভুক্ত ব্যক্তির আগমন অমঙ্গল বলে মনে করা হয়।
দিবানিদ্রা ও সন্ধ্যার নিয়ম
দিবানিদ্রা বা দুপুরে বেশি ঘুমানো হিন্দু ধর্মে পাপ। চেষ্টা করুন দুপুরে অল্প সময়ের শয়ন করতেই। সন্ধ্যায় সূর্য ডোবার পর আহার গ্রহণ পাপ; এ সময় খেলে রাক্ষস হয়। সন্ধ্যায় চুল আঁচড়ানো, ভোজ, শয়ন, মলিন বস্ত্র পরিধান করাও পাপ।
সন্ধ্যায় মহিলারা তুলসী প্রাঙ্গণে প্রদীপ জ্বালান ও ঠাকুরঘরে ধূপ-ধুনো দিন। একত্র হয়ে ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ, কীর্তন ও গুরু মন্ত্র জপ করুন। বাড়ির বাচ্চাদেরও শেখান।
রাত্রির অভ্যাস
অফিস থেকে বাড়ি ফিরে পুরুষেরা পরিষ্কার বস্ত্র পরিধান করে গুরু প্রদত্ত মন্ত্র জপ করুন। যারা দীক্ষিত নন, তারা ভগবানের নাম কীর্তন বা ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করুন। লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় ধর্মীয় কাজ করা নিষিদ্ধ।
রাতে রুটি খাওয়ার অভ্যাস করুন। সপ্তাহে অন্তত দুই দিন নিরামিষ আহার করুন। শাস্ত্রে নিষিদ্ধ খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। ঘুমানোর আগে ঈশ্বরকে প্রণাম করুন। বালিশ মাথায় দেওয়ার আগে বালিশকেও প্রণাম করুন, কারণ এতে ভগবান নারায়ণ অবস্থান করেন।
উপবাস ও বারব্রত
একাপদশী, অমাবস্যা, পূর্ণিমা, বারব্রত ইত্যাদি তিথিতে উপবাস রাখুন। একদিন না খেলে কোনো ক্ষতি হবে না। সেই দিনগুলোতে ভগবানের ফলপ্রসাদ ও দুগ্ধ গ্রহণ করুন। বিধবা, সধবা ও ৫ বছরের উপরের সবাই একাদশী ও বারব্রত পালন করতে পারেন। ধর্মগ্রন্থ অনুসরণ না করলে সুখে থাকা কঠিন। তাই শাস্ত্র মেনে চলুন।
আপনার দৈনন্দিন জীবনে এই নিত্যকর্মগুলি অনুসরণ করলে শারীরিক ও মানসিক শান্তি লাভ হবে এবং ধর্মীয় জীবন সহজতর হবে।

Comments
Post a Comment